Answer
উত্তর: লোক শিল্প লোকশিল্প সাধারণ লোকের জন্য, সাধারণ লোকের দ্বারা সৃষ্টি। বিত্তবানের সংগ্রহশালা কিংবা জাদুঘরে স্থান পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা তৈরি নয়। সাধারণ উপকরণে তৈরী এ শিল্প সামগ্রী সর্বসাধারণের মনোরঞ্জনের জন্যে বলে তার আবেদন সহজ এবং তা সহজলভ্যও বটে। লোকশিল্পের উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে আদিম যুগ ও তার শিল্প সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। প্রাগৈতিহাসিক যুগে, হয়তো তখন সবেমাত্র অগ্নি প্রজ্জ্বলন প্রক্রিয়া আবিষ্কৃৃত হয়েছে, পশু শিকার তখনও একমাত্র জীবিকা; চারিদিকে তখন গোষ্ঠীসংগ্রাম চলছে, অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রস্তর, তখনই মানুষ নয়নমনোহর সুন্দরের পূজা শুরু করতে শিখেছে। খুব সচেতনভাবে না হলেও তাদের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসগুলো নানা নকশায় ভরে তুলত। গুহা প্রাচীরের গায়ে এঁকে রাখতো নানারকম কল্পিত দেবতার চিত্র এবং চমৎকার অঙ্গসজ্জা। বেঁচে থাকার জন্য সেটা ছিল সংগ্রামের যুগ। নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে সেটি ছিল চারপাশে ছড়ানো, অজানা, অজস্র রহস্য, অলৌকিকতা ও জাদুবিদ্যায় মানুষের দৃঢ়বিশ্বাস ও সংস্কার সমন্বিত নানা আচার অনুষ্ঠানের যুগ। এই বিশ্বাস ও সংস্কারকে সামনে রেখেই পার্বত্য গুহা চিত্রাঙ্কনের রীতিটি দেখা দিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল পর্বতগাত্রে পশুদেবতার চিত্র অঙ্কন করলেই দেবতা খুশী হবেন এবং শিকার করা সহজ ও সার্থক হবে। এমনি নানা বিশ্বাস-সংস্কারে বশীভূত ছিল তৎকালীন সমাজ। এই সংস্কারের পথ ধরেই গুহাচিত্রের উদ্ভব এবং ক্রমে আদিম সংস্কারের বাহুবন্ধন থেকে বিচ্যুত হয়ে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারিক প্রয়োজন পূরণের তাগিদই বড় হয়ে উঠে। তখন থেকেই দেবতার কল্পিত প্রতীক গাছ, পাথর, ইত্যাদির গৃহদেবতা বা গ্রাম্যদেবতার মর্যাদা প্রাপ্তি এবং মানুষ তাঁদেরকে শিল্পে, সৌন্দর্যে ও অলংকরণে ছিল সচেষ্ট। এইভাবে শিল্পে আসে লোকায়িত ভাব। আদিম শিল্প ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় লোকশিল্পে। এ প্রসঙ্গে পল্লব সেনগুপ্ত বলেন,
শিকার সংগ্রহ, কৃষি এবং অন্যবিধ উপলক্ষ্যগুলির সূত্রে বিভিন্ন শ্রম প্রক্রিয়া একদিকে; আর অন্যদিকে অনির্দেশ্য অলৌকিক প্রত্যয় এবং জাদুসংস্কার- একসঙ্গে মিলে গিয়ে সৃষ্টি করেছিল এইসব প্রয়োগকলার। সময়ের বিবর্তনে অনেক সময়ে এসবের মূল তাৎপর্যটুকু হয়তো বিস্তৃতিবিলীন হয়েছে, কখনও বা নূতনতর কোনও ব্যঞ্জনা আরোপিত হয়েছে; আদিম শিল্পকলা বিবর্তিত হয়ে পরিণতি পেয়েছে লোকশিল্পে।
একই অভিমত পোষণ করে হ্যারিসন বলেছেন, প্রাচীনকালে সব শিল্পকলার সৃষ্টি হয় ধর্ম ও ইন্দ্রজালের উৎস থেকে। নিরন্তর তাদের যাত্রায় তারা সে আদিমতা পরিহার করে স্বকীয় রূপ ধারণ করেছে। দীপক কুমার বড় পান্ডা লোকশিল্পের উদ্ভবকাল এবং উদ্ভাবকদের সম্পর্কে একটা আনুমানিক সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেছেন,
তখন ভারতবর্ষের সুপ্রাচীনকাল। তখনও কুলীন-অকুলীন কথাগুলির উৎপত্তি হয়নি। জাত বা শ্রেণীবিভাজন ছিল অকল্পনীয়। কৃষিশিল্পের সৃষ্টি হয়নি; কারুশিল্প গড়ে উঠেনি। তখনও এদেশের কিছু মানুষ ছুতারের দারুশিল্প, কুমোরের মৃৎশিল্প, কামারের ধাতুশিল্পে যুক্ত ছিল। উক্ত শিল্পগুলো দৈনন্দিন ব্যবহার্য এবং নান্দনিকও ছিল। পরবর্তীতে এইসূত্রে সৃষ্টি হয়েছে গ্রামীন আসবাবপত্র, মৃৎশিল্প, পোড়ামাটির মূর্তি, সূচীশিল্প, বয়নশিল্প, দেয়ালচিত্র, ডোকরাশিল্প, মুখোশশিল্প, অলংকার শিল্প, বস্ত্রশিল্প, বেত-বাঁশশিল্প, দারুশিল্প, আল্পনাশিল্প, মন্দির মসজিদ অলংকরণ, কবরীরচনা শিল্প, ডাক শোলার শিল্প ইত্যাদি। এগুলি সমগ্র মানবসমাজের সৃষ্টি বলে প্রকৃত অর্থে এগুলিকে লোকশিল্প বলা হয়।