Answer Answer: বর্তমান বিশ্বের সর্বাধিক আলোচিত বিষয়সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। বহুল আলোচিত এ প্রত্যয়টিকে এখন সামাজিক উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেবলমাত্র মানবেতর অবস্থা থেকে নারীর মুক্তি বা নারী উন্নয়নের জন্যই নয়, পৃথিবী মুখোমুখি এমন সকল সমস্যার সমাধানে প্রধান ও প্রথম ধাপ হিসাবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কেবল আনত্মর্জাতিক পরিসরে নয়, বাংলাদেশেও স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পরিসরে যে কোনো নীতি নির্ধারনী আলোচনায় বা সমস্যা সমাধানে নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও দেশজুড়ে নারী হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন ক্রমশ: বেড়েই চলেছে। নারীর পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে ক্রমশ: অবনতি হচ্ছে। তাই এ প্রসঙ্গটির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ নারী । তাদের উন্নয়ন তাই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে লিঙ্গ বৈষম্য ও নারীদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করে ইউএনডিপি-র সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) থেকে এই ব্যাপারে অনেক দেশ থেকে এগিয়ে আছে।বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার পদসমূহ নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে, জাতীয় সংসদে মহিলা সাংসদের সংখ্যা ২০% এ এসে দাঁড়িয়েছে, যা পৃথিবীর যেকোনো দেশে বেশ বিরল। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত হল পোশাকশিল্প, যার সিংহভাগ নারী কর্মী। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ অনেক বেশি অগ্রগতি সাধন করেছে, যা জাতীয় উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখে যাচ্ছে। আর এই ক্ষুদ্রঋণ গ্রহিতাদের মাঝে নারী গ্রহিতাই ৮০%-এর বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নারীর এত ক্ষমতায়নের পরেও কি এদেশে নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে? নারীদের প্রতি নির্যাতন, বৈষম্য কি সামান্য পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে? উত্তরে বলবো 'না'। বাংলাদেশ এখনও নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এখনও পারেনি নারী নির্যাতন রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। বরং নারীর প্রতি সহিংসতা আরও মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নারীকে ধর্ষণ করে দিল্লির ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়েছে বাংলাদেশেও। চট্টগ্রামে সিএনজি চালিত অটো রিকশায় ধর্ষিত হয়েছেন এক নারী। নারীর প্রতি যৌন লালসার হিংস তা থেকে বাদ যাচ্ছে না নারী শিশুরাও। নারী আজ কর্মস্থলে নিরাপদ নয়। শিকার হচ্ছে ইভটিজিংয়ের তারই সহকর্মীর দ্বারা। নারী তাই সমাজ থেকে শুধু প্রতারিতই হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিবন্ধকতা সমূহ: বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিবন্ধকতা সমূহ হচ্ছে:- ক) পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ খ) পিতৃতন্ত্রের সপক্ষে রচিত আইন কানুন গ) ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি ঘ) আধুনিকায়ন উন্নয়ন কৌশলের অনুসরণ ঙ) পরিবেশ বিপর্যয় চ) উপযুক্ত শিক্ষার অভাব ছ) সচেতনতার অভাব জ) সমাজে নারীর প্রতি গড়ে উঠা দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ ইত্যাদি।
নারীর ক্ষমতায়নের উপায়: বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের উপায় হচ্ছে:- ক) রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ ও ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত নারীদের দায়িত্ব প্রাপ্তি খ) নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টিকারী আইন পরিবর্তন গ) সার্বজনীন পারিবারিক আইন বাসত্মবায়ন ঙ) প্রচার মাধ্যমে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বন্ধ চ) নারীর কাজের স্বীকৃতি প্রদান ছ) সকল প্রকার কাজ অভিগম্যতা ও গৃহস্থলী কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ জ) স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ধারা অনুসরণ ঝ) রাজনীতির গণতন্ত্রায়ন
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে চিন্তাশীল মানুষকে আরও সজাগ হতে হবে। র্সবস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নারী সমাজের জীবনের বাস্তব দিকগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা এবং তার অবস্থান কোথায় বা কোথায় থাকা উচিত তা উপলব্ধি করতে পারাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়নের যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতির পরও আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়াটা দু:খজনক। নারীদের নিরাপত্তা কোথাও নেই । কারণ নারীরা একা একা চলতে সাহস পায় না। সন্ধ্যার পর একজন নারীকে বাইরে বের হতে হলে তাকে ঘরে ফেরা পর্যনত্ম সন্ত্রস্ত্র থাকতে হয়। আমাদের সমাজে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহিংসতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়না । যে সহিংস আচরণ করছে তাকে দোষী না করে বরং যার প্রতি সহিংসতা করা হলো তাকেই দোষী সাব্যস্থ করা হয়। সহিংসতা সম্বন্ধে সমাজে সচেতনতার এই অভাব পূরণে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে। নারীর প্রতি সহিংস আচরণ সমাজে বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াও সামাজিক সহিংসতা যথেষ্ঠ পরিমাণে বেড়েছে যা মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে। মানব সমাজ জ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে যতটা সভ্যই হোক না কেন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো কেনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় নিতানত্মই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। নারীর সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, বঞ্চনা বৈষম্য এগুলো মোটেই কাম্য নয়। আর অযৌক্তিক আচরণ দূর হোক এ প্রত্যাশা আমাদের। সত্যিকারার্থে নারীকে যথার্থ মূল্যায়ন না করে সুন্দর শানত্মিময় সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা আশা করাটাও ঠিক হবে না। নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার, এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না করে যৌক্তিক পন্থায় সবাই এগিয়ে আসুক এটাই কাম্য।