Answer Answer: এই লেখাগুলোকে কখনই হুবহু উত্তর মনে করবেন না। শুধু আপনাদের ধারনা নেয়ার জন্য কিছু text দেয়া হয়েছে। আশা করি এখন নিজের মতো করে পরীক্ষার খাতায় লিখবেন।
ব্যাপক জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে জনসম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি অন্যতম জাতীয় চ্যালেঞ্জ। সরকারি, বেসরকারি, প্রযুক্তিগত, সেবাখাত, কৃষিখাতের পাশাপাশি স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে সমগ্র দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। গবেষণা, প্রশিক্ষণ, তথ্য সেবা ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে থাকে জাতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সমিতি, বাংলাদেশ (নাসিব)।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তার নিজস্ব ধারায় প্রবাহিত এক প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা। এ শিল্পের মধ্যে প্রধানত তাঁতশিল্প, হস্তশিল্প, মৃিশল্প, বাঁশ-বেতের শিল্প, ঝিনুক শিল্প, পাট শিল্প, খাদ্য ও খাদ্যজাত দ্রব্যাদি, বস্ত্রশিল্প, সিরামিক শিল্প, রাবার শিল্প ও চামড়া শিল্প অন্যতম। অতীতে এই শিল্পের ঐতিহ্য ছিল প্রশংসনীয়। আধুনিকায়ন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে অবহেলিত এই খাত। তারপরও বাংলাদেশের জিডিপিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম।
এশিয়ার বেশকিছু সমৃদ্ধশালী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এর ওপর ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ সরকারও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উন্নয়নকে শিল্পায়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করে এ খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আমরা জানি, দেশীয় পণ্য হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কাঁচামালের উত্স। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার সম্ভব। অন্যদিকে স্বল্প পুঁজি ও দক্ষতা নিয়ে এই শিল্প গড়ে তোলা হয় বলে এই শিল্পের মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়ন বিকশিত হয়। তবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় কাঁচামাল সংকটের আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থাপনে শিল্পনীতি ২০১০ অনুযায়ী মাঝারি শিল্প স্থাপনে তেমন কোনো অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। তবে কিছু নিয়ম পালন করতে হয়। যেমন—মূলধনের পরিমাণ দশ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, ট্রেড লাইসেন্স, জনস্বাস্থ্য ও বিদ্যুত্ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমতি লাগবে। বিসিক কর্তৃক রেজিস্ট্রি হলে ক্ষুদ্র শিল্পগুলো ব্যাংক হতে ঋণ গ্রহণ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হতে কর অবকাশ পেয়ে থাকে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দেশের ঐতিহ্য বহন করলেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ইত্যাদি কারণে কিছু কিছু ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ হুমকির মুখে এবং কিছু কিছু শিল্প এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে।
প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রযুক্তির যথাযথ উত্কর্ষের বিকল্প নেই। সরকার ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করলেও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বা উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেশের তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিতে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং তথা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিউক্লিয়াস বা প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় তাদের যথাযথ সুযোগ কিংবা সহযোগিতা না থাকার কারণে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো এ শিল্প বিকশিত হচ্ছে না। বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের অন্তর্গত। তাই সরকারের EEF কিংবা ইক্যুয়িটি এন্টারপ্রনারশিপ ফান্ডের নামে শুভঙ্করের ফাঁকির পরিবর্তনে সহজ-সরল ও সহনীয় ঋণ সুবিধার মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। তাহলেই এদেশে গড়ে উঠবে ইনফোসিস, উইপ্রো, মাইক্রোসফট, অ্যাপল কিংবা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান।
শিল্পনীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে, বিকেন্দ্রীকৃত কর্মসংস্থান ও অধিকসংখ্যক নারী শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দারিদ্র দূরীকরণের অন্যতম মাধ্যম হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। তাছাড়া এতে বলা আছে, যেখানে সম্ভব সেখানে পুঁজিঘন শিল্পের পরিবর্তে শ্রমঘন শিল্প স্থাপনাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে শিল্পনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বর্ণিত শর্তাদির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেবে সরকার। এ জন্য জমি, অর্থায়ন, ব্যবসায় সহায়তামূলক সেবা লাভের ক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশধিকার নিশ্চিত করবে সরকার।
বাংলাদেশের জিডিপিতে গড়ে প্রায় ৪০% অবদান রাখছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। দেশের প্রায় ১ কোটি উদ্যোক্তার মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের। কর্মসংস্থানের সিংহভাগই হচ্ছে এ খাতে। বিভিন্ন ধরনের পণ্যের প্রসারে এ খাত অবদান রাখছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ খাতের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে অর্থসংস্থান। আর অর্থ সংকটের কারণে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও সঠিক বিকাশ ঘটছে না এ খাতের।
এসএমই ফাউন্ডেশনের গবেষণাসহ অন্যান্য গবেষণায় দেখা যায়, উদ্যোক্তারা মোট ব্যবসার পুঁজির ২০% প্রাতিষ্ঠানিক সুদ দিয়ে অর্থসংস্থান করে থাকে। উদ্যোক্তাদের কাছে প্রধান সমস্যা চড়া সুদে অর্থসংস্থান। স্বাধীনতা লাভের ৪৪ বছরেও এ সমস্যার সমাধান হয়নি। সমাধান না হওয়ার কারণ ব্যাংকের গতানুগতিক জামানতভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক ছোট এবং মাঝারি ব্যবসার শিল্পোদ্যোক্তাদের অর্থসংস্থানের বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে, তারপরও অর্থসংস্থানে ব্যাংক ঋণ তুলনামূলকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। ছোট ব্যবসায় অর্থসংস্থানে ব্যাংকের ঋণের ভাগ কমে আসছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এনজিওগুলো ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ করে আর্থিক মুনাফা লাভ করছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে পাবলিক-প্রাইভেট ব্যাংকিংয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অর্থায়ন মাঝারি ও বড় ব্যবসা কিংবা শিল্প খাতে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসব খাতের ভূমিকা কম। সেক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যয় বেশি হচ্ছে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, সহনীয় ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করাই অন্যতম প্রধান সমাধান। আর শিল্প-ঋণের অতিরিক্ত সুদের কারণে দেশে শিল্পায়ণ প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শিল্পোদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চ হার সুদে শিল্পঋণ দিচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট পলিসি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। এ ধরনের পলিসি গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য ব্যাংকগুলোর সহযোগিতা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলোর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর নির্ভর করলেও এসএমই খাতে অর্থায়ন একটি বিরাট সমস্যা। এডিবি তহবিল থেকে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৫% সুদে ঋণ বরাদ্দ দিলেও ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক হারে ঋণ দিচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তারা এক অংকের সুদে ঋণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই সরকারের উচিত পাবলিক ও প্রাইভেট ব্যাংকসমূহকে যত দ্রুতসম্ভব জবাবদিহিতার মধ্যে আনা।
বিশ্বায়নের যুগে দেশীয় শিল্প বিকাশের জন্য বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জনের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলো উদ্যোক্তাদের যে ধরনের আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে, দেশীয় উদ্যোক্তাদের একই ধরনের সহায়তা দিতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদে ঋণ দিলে দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সম্প্রসারিত করতে দরকার সমন্বিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তি ও বিপণনের জন্য সরকারি সহযোগিতা।
প্রকৃতপক্ষে দেশের অর্থনীতির চাকাকে শক্তিশালী করতে সরকার ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংগঠনের (অ্যাসোসিয়েশন ও চেম্বার) উদার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশগুলোর অর্থনীতিতে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশও তাদের সমকক্ষ বা ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। এক্ষেত্রে একটি মানবিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক :শিল্পোদ্যোক্তা, কূটনীতিক, সংগঠক ও বাণিজ্য বিশ্লেষক। [সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক। ]