Answer
পল্লী উন্নয়ন বলতে সাধারণতঃ জীবন ও অর্থনৈতিক মান উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে বুঝানো হয় যা পৃথক ও বিক্ষিপ্ত জনবহুল এলাকার সাথে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত।প্রচলিত ধারায় পল্লী উন্নয়ন কৃষি ও বনের ন্যায় প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও শহরাঞ্চলের উত্তরোত্তর পরিবর্তনের ফলে গ্রাম্য এলাকার বৈশিষ্ট্যাবলী দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্পদের বিচ্ছুরণ ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষিজ সম্পদের পরিবর্তে পর্যটন, উৎপাদক এবং বিনোদন ব্যবস্থা স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ততার ফলে উন্নয়নের লক্ষ্যস্থলকে বৃহৎ দৃষ্টিতে প্রসারণ ঘটানোয় কৃষি অথবা প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যাংক অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে। শিক্ষা, উদ্যোক্তা, বাহ্যিক অবকাঠামো ও সামাজিক অবকাঠামো তৈরিতে ব্যাংক গ্রাম্য এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।এছাড়াও পল্লী উন্নয়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে রয়েছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।বিপরীতক্রমে শহুরে এলাকার সাথে অনেক বিষয়ে মিল থাকলেও গ্রাম্য এলাকার সাথে একে-অপরের পার্থক্য বিশাল ও ব্যাপক। এ প্রেক্ষিতে পল্লী উন্নয়নের বিভিন্ন কৌশল ও রূপরেখা বিশ্বব্যাপী প্রচলিত রয়েছে।
বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির গ্রামীণ শাখাসমূহ, কিছু বেসরকারি ব্যাংকের সীমিতসংখ্যক গ্রামীণ শাখা, সমবায় ব্যাংক ও সমবায় সমিতিসমূহ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য বিশেষায়িত ব্যাংক ও সংস্থাসমূহ। কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে তহবিল প্রবাহ সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করা হয়। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা, সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি, গ্রামীণ ব্যাংক, স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচি এবং এনজিওসমূহ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী ত্রিশ বছরে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেলেও, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিকেবি এবং রাকাব একত্রে প্রায় ৫০% কৃষিঋণ প্রদান করেছে। অবশিষ্ট ৫০% আসে অনানুষ্ঠানিক ঋণবাজার বা উৎসসমূহ থেকে। সমগ্র দেশে সমন্বিতভাবে কৃষিঋণ বিতরণের জন্য বর্তমানে একটি লিড ব্যাংক স্কিম চালু রয়েছে। এ স্কিমের অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিকেবির প্রত্যেক শাখাকে এক বা একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাকাব ও বিকেবি দেশের সকল এলাকাকে তাদের ঋণসুবিধার আওতায় আনতে পারে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর কৃষিঋণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রচার করে। ব্যাংকগুলি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্দেশিত ঐ নীতিমালা অনুযায়ী তাদের ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণদান নীতিমালার আলোকে নিজস্ব ঋণ প্রদান নীতিমালা প্রণয়ন করে।
বাংলাদেশে কৃষিঋণ বাজারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও ভঙ্গুর। কেননা, অধিকাংশ কৃষিঋণ অনুৎপাদনশীল। এর একটি বৃহদাংশ গ্রামের অপেক্ষাকৃত ধনী কৃষক এবং এলিট ও টাউটগণ গ্রাস করে ফেলেছে। অপরদিকে প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অনানুষ্ঠানিক ঋণ বাজারে চালান হয়ে পুনরায় কৃষকদের নিকট উচ্চহার সুদে বিতরণ করা হচ্ছে। গ্রামের দরিদ্র কৃষক এবং অন্যান্য পেশার লোকজন এ সকল অনানুষ্ঠানিক ঋণের গ্রাহক। এছাড়া এসব ঋণের বেশিরভাগ ভোগ্যপণ্য ক্রয় ও অপরাপর অনুৎপাদনশীল কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। সর্বোপরি, দেশের কৃষিঋণ আদায়ের হার মাত্র ৪২%, যা এ ঋণবাজারের সম্প্রসারণের পথে একটি কঠিন বাধা।
পল্লী অর্থসংস্থানে বিভিন্ন এনজিও সমষ্টিগতভাবে অপর একটি শক্তিশালী আনুষ্ঠানিক তহবিল সরবরাহকারী গ্রুপ। সাধারণত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যে অংশ ব্যাংক এবং অপরাপর প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ পায় না, সে সকল লোকদের ঋণতহবিল সরবরাহে এনজিওদের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। কিছু কিছু এনজিও শহুরে দরিদ্রদের মধ্যেও তাদের ঋণদান কার্যক্রম চালাচ্ছে।
পল্লী অর্থসংস্থান ব্যবস্থাকে দারিদ্র বিমোচনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি দারিদ্র দূরীকরণের অনেকগুলি চালকের মধ্যে একটি মাত্র। সহায়ক সরকারি নীতিমালা, পল্লী অর্থবাজারের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা এবং অনানুষ্ঠানিক সেবাসমূহের সহজলভ্যতার ওপর পল্লী অর্থসংস্থানের কার্যকর ব্যবহার ও প্রয়োগ নির্ভর করে। আয়বিহীন অতি দরিদ্র জনগণ উন্নত আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো, আয় স্থানান্তর, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন নীতিমালার প্রণয়ন ও প্রয়োগ দ্বারা সরাসরি উপকৃত হয়ে থাকে। আয়বৈষম্য সৃষ্টি, সম্পদের অনুৎপাদনশীল ও অসম বণ্টন, মাঝারি ও বৃহদাকার ঋণ প্রদানে ব্যর্থতা এবং সর্বোপরি, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হওয়ার জন্য পল্লী অর্থসংস্থান ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সমালোচিত। গ্রহীতাগণ কর্তৃক তাদের গৃহীত পল্লীঋণের অনুৎপাদনশীল ব্যবহার পল্লী আর্থিক ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
পল্লী অর্থসংস্থানে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকসমূহ সর্বদাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ইতোমধ্যে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকসমূহসহ সকল তফসিলী ব্যাংককে কৃষি ঋণ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কৃষিঋণ বিতরণের জন্য নীতিমালা সহজতর করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্র্যাকসহ কয়েকটি এনজিওর মাধ্যমে লিংকেজ (Linkage) কর্মসূচির আওতায় ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ (Micro-credit) প্রদান কার্যক্রমেও ব্যাংকসমূহ ক্রমবর্ধমান হারে অংশ গ্রহণ করছে। ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছরে ব্যাংকসমূহ ৯৩৭৯.২৩ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করে যার বিপরীতে ২০০৯-১০ অর্থবছরে বিতরণকৃত এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১১১৬.৮৮ কোটি টাকা। ব্যাংকসমূহ ছাড়াও সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা পল্লী কর্মসংস্থান ফাউন্ডেশন (PKSF) এবং এনজিওসমূহ দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সমস্ত সংস্থার বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪৭৩১.৭৯ কোটি টাকা এবং ঋণ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি। এসব ঋণের সিংহভাগই পল্লী এলাকায় প্রদত্ত যার আদায়ের হার শতকরা প্রায় ৯৯ ভাগ।
পল্লী উন্নয়নের জন্য সরকার বাজেটেও প্রতিবছর বর্ধিত হারে বরাদ্দ রেখে আসছে।সাথে সাথে সরকারি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহকে গ্রাম বাংলার মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। পল্লী উন্নয়নের উদ্দেশ্যাবলী হিসেবে গ্রামীণ জীবনধারার সাথে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে সম্পৃক্ত করার পথ খোঁজা ও গ্রামীণ এলাকায় অবস্থান করে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য সব ধরনের ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা পল্লী উন্নয়নের উপর নির্ভর করে একটি দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো।