Answer
উত্তর: লোক শিল্প লোকশিল্প সাধারণ লোকের জন্য, সাধারণ লোকের দ্বারা সৃষ্টি। বিত্তবানের সংগ্রহশালা কিংবা জাদুঘরে স্থান পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা তৈরি নয়। সাধারণ উপকরণে তৈরী এ শিল্প সামগ্রী সর্বসাধারণের মনোরঞ্জনের জন্যে বলে তার আবেদন সহজ এবং তা সহজলভ্যও বটে। লোকশিল্পের উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে আদিম যুগ ও তার শিল্প সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। প্রাগৈতিহাসিক যুগে, হয়তো তখন সবেমাত্র অগ্নি প্রজ্জ্বলন প্রক্রিয়া আবিষ্কৃৃত হয়েছে, পশু শিকার তখনও একমাত্র জীবিকা; চারিদিকে তখন গোষ্ঠীসংগ্রাম চলছে, অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রস্তর, তখনই মানুষ নয়নমনোহর সুন্দরের পূজা শুরু করতে শিখেছে। খুব সচেতনভাবে না হলেও তাদের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসগুলো নানা নকশায় ভরে তুলত। গুহা প্রাচীরের গায়ে এঁকে রাখতো নানারকম কল্পিত দেবতার চিত্র এবং চমৎকার অঙ্গসজ্জা। বেঁচে থাকার জন্য সেটা ছিল সংগ্রামের যুগ। নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে সেটি ছিল চারপাশে ছড়ানো, অজানা, অজস্র রহস্য, অলৌকিকতা ও জাদুবিদ্যায় মানুষের দৃঢ়বিশ্বাস ও সংস্কার সমন্বিত নানা আচার অনুষ্ঠানের যুগ। এই বিশ্বাস ও সংস্কারকে সামনে রেখেই পার্বত্য গুহা চিত্রাঙ্কনের রীতিটি দেখা দিয়েছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল পর্বতগাত্রে পশুদেবতার চিত্র অঙ্কন করলেই দেবতা খুশী হবেন এবং শিকার করা সহজ ও সার্থক হবে। এমনি নানা বিশ্বাস-সংস্কারে বশীভূত ছিল তৎকালীন সমাজ। এই সংস্কারের পথ ধরেই গুহাচিত্রের উদ্ভব এবং ক্রমে আদিম সংস্কারের বাহুবন্ধন থেকে বিচ্যুত হয়ে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারিক প্রয়োজন পূরণের তাগিদই বড় হয়ে উঠে। তখন থেকেই দেবতার কল্পিত প্রতীক গাছ, পাথর, ইত্যাদির গৃহদেবতা বা গ্রাম্যদেবতার মর্যাদা প্রাপ্তি এবং মানুষ তাঁদেরকে শিল্পে, সৌন্দর্যে ও অলংকরণে ছিল সচেষ্ট। এইভাবে শিল্পে আসে লোকায়িত ভাব। আদিম শিল্প ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় লোকশিল্পে। এ প্রসঙ্গে পল্লব সেনগুপ্ত বলেন,
শিকার সংগ্রহ, কৃষি এবং অন্যবিধ উপলক্ষ্যগুলির সূত্রে বিভিন্ন শ্রম প্রক্রিয়া একদিকে; আর অন্যদিকে অনির্দেশ্য অলৌকিক প্রত্যয় এবং জাদুসংস্কার- একসঙ্গে মিলে গিয়ে সৃষ্টি করেছিল এইসব প্রয়োগকলার। সময়ের বিবর্তনে অনেক সময়ে এসবের মূল তাৎপর্যটুকু হয়তো বিস্তৃতিবিলীন হয়েছে, কখনও বা নূতনতর কোনও ব্যঞ্জনা আরোপিত হয়েছে; আদিম শিল্পকলা বিবর্তিত হয়ে পরিণতি পেয়েছে লোকশিল্পে।
একই অভিমত পোষণ করে হ্যারিসন বলেছেন, প্রাচীনকালে সব শিল্পকলার সৃষ্টি হয় ধর্ম ও ইন্দ্রজালের উৎস থেকে। নিরন্তর তাদের যাত্রায় তারা সে আদিমতা পরিহার করে স্বকীয় রূপ ধারণ করেছে। দীপক কুমার বড় পান্ডা লোকশিল্পের উদ্ভবকাল এবং উদ্ভাবকদের সম্পর্কে একটা আনুমানিক সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেছেন,
তখন ভারতবর্ষের সুপ্রাচীনকাল। তখনও কুলীন-অকুলীন কথাগুলির উৎপত্তি হয়নি। জাত বা শ্রেণীবিভাজন ছিল অকল্পনীয়। কৃষিশিল্পের সৃষ্টি হয়নি; কারুশিল্প গড়ে উঠেনি। তখনও এদেশের কিছু মানুষ ছুতারের দারুশিল্প, কুমোরের মৃৎশিল্প, কামারের ধাতুশিল্পে যুক্ত ছিল। উক্ত শিল্পগুলো দৈনন্দিন ব্যবহার্য এবং নান্দনিকও ছিল। পরবর্তীতে এইসূত্রে সৃষ্টি হয়েছে গ্রামীন আসবাবপত্র, মৃৎশিল্প, পোড়ামাটির মূর্তি, সূচীশিল্প, বয়নশিল্প, দেয়ালচিত্র, ডোকরাশিল্প, মুখোশশিল্প, অলংকার শিল্প, বস্ত্রশিল্প, বেত-বাঁশশিল্প, দারুশিল্প, আল্পনাশিল্প, মন্দির মসজিদ অলংকরণ, কবরীরচনা শিল্প, ডাক শোলার শিল্প ইত্যাদি। এগুলি সমগ্র মানবসমাজের সৃষ্টি বলে প্রকৃত অর্থে এগুলিকে লোকশিল্প বলা হয়।
Answer
উত্তর: সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য জাতিসংঘ কর্তৃক যেসব-লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছিল, তার একটি হলো শিশু-মৃত্যুহার হ্রাস করা। সহস্রাব্দের শুরুতে ২০০০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদর অধিবেশনে আটটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছিল। ১৫ বছরে এ টার্গেট পূরণ করা হবে। একে বলা হয় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা_ইংরেজিতে সংক্ষেপে বলা হয় 'এমডিজি' (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস্)।সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো হচ্ছে : ১. চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলকরণ, ২. সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, ৩. নারী-পুরুষ সমতা অর্জন. ৪. শিশু মৃত্যু হার কমানো, ৫. মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, ৬. এইচআইভি বা এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগনিয়ন্ত্রণ, ৭. পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ৮. উন্নয়নর ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অংশীদারি গড়ে তোলা।
(গ) আর্সেনিক সমস্যা; আর্সেনিক মূলত একপ্রকার রাসায়নিক উপাদান। পানিতে স্বল্প মাত্রায় আর্সেনিক সব সময়ই থাকে। কিন্তু যখনই এই মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি হয়ে যায়, তখনই তা পানকারীর শরীরের নানা রকম রোগের উপসর্গ তৈরি করে এবং পরবর্তিতে সেই সকল রোগব্যাধিকে মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যায়।পুরো বিশ্ব থেকে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণের মোটামুটি ২০টি ঘটনা জানা যায়।এর মধ্যে, চারটি গুরুতর ঘটনাই পাওয়া গেছে এশিয়াতে। এর মধ্যে থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানের কিছু এলাকা এবং চীনের মূল ভূখন্ড রয়েছে। বাংলাদেশে আর্সেনিক সমস্যা বলতে বোঝানো হয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঞ্চলে খাবার পানিতে আর্সেনিকের মাত্রাতিরিক্ত হার, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী ১ লিটার পানিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক থাকলে সেই পানি দূষিত। বাংলাদেশের মান অনুযায়ী ১ লিটার পানিতে ৫০ মাইক্রোগ্রাম আর্সেনিক থাকলে সেই পানিকে নিরাপদ পানি বলা হয় না বাংলাদেশে, সর্বপ্রথম ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বড়ঘরিয়া ইউনিয়নের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি আবিষ্কৃত হয়। এরপর ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে বাংলাদেশের ৬১টি জেলার নলকূপের পানি পরীক্ষা করে জানায়: ৪২% নলকূপের পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানের চেয়ে বেশি (২৫% নলকূপের পানিতে বাংলাদেশের মানের চেয়ে বেশি) মাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে। দিনে দিনে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে চলেছে।আর্সেনিক বিষক্রিয়া থেকে মুক্তির জন্য আপাতত প্রতিরোধক ব্যবস্থাই সবচেয়ে উপযোগী। ব্যক্তিগত পর্যায়ে করণীয়গুলো হলো:
আর্সেনিকযুক্ত নলকূপের পানি পান ও রান্নার কাজে ব্যবহার না করা। নিকটে আর্সেনিকমুক্ত নলকূপ পাওয়া না গেলে পুকুর বা নদী হতে ১ কলসি পানিতে আধা চামচ ফিটকিরি মিশিয়ে ২-৩ ঘণ্টা রেখে দিয়ে, পরে উপর থেকে তলানিবিহীন পরিষ্কার পানি পান করতে হবে। বৃষ্টির পানি যেহেতু আর্সেনিকমুক্ত, তাই বৃষ্টি আরম্ভ হবার ৫ মিনিট পর সরাসরি পরিষ্কার পাত্রে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে তা পান করতে হবে।
(ঙ) ছয় দফা কর্মসূচি ১৯৬৬; ছয়দফা কর্মসূচি পাকিস্তানের দু অংশের মধ্যকার বৈষম্য এবং পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশিক শাসনের অবসানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচি। তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের অবসানের পর পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের চরম অবহেলা ও ঔদাসীন্যের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোচ্চার হন। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতারা তাসখন্দ-উত্তর রাজনীতির গতিধারা নিরূপণের উদ্দেশ্যে ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক জাতীয় সম্মেলন আহবান করেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সম্মেলনে যোগদানের জন্য ৪ ফেব্রুয়ারি লাহোর পৌঁছেন। পরদিন সাবজেক্ট কমিটির সভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দাবি হিসেবে ‘ছয়দফা’ প্রস্তাব পেশ করেন এবং তা সম্মেলনের আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। কিন্তু সম্মেলনের উদ্যোক্তারা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরদিন পশ্চিম পাকিস্তানি পত্রপত্রিকায় ছয়দফার বিবরণ ছাপিয়ে শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরূপে চিত্রিত করা হয়। ফলে শেখ মুজিব ৬ ফেব্রুয়ারির সম্মেলন বর্জন করেন। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয়দফা প্রস্তাব এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমদের ভূমিকা সম্বলিত ছয় দফা কর্মসূচির একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ‘আমাদের বাঁচার দাবি: ৬-দফা কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রচার করা হয়।
ছয় দফায় বিধৃত দাবিসমূহ নিম্নরূপ: ১.লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংবিধান রচনা করে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশনে পরিণত করতে হবে, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত আইন পরিষদ সার্বভৌম হবে; ২.ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে শুধু দুটি বিষয়, প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক সম্পর্ক, এবং অপর সব বিষয় ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত রাজ্যসমূহের হাতে ন্যস্ত থাকবে; ৩. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটিই মুদ্রাব্যবস্থা থাকবে, একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও দুটি আঞ্চলিক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থাকবে। তবে এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পুঁজি যাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে তার ব্যবস্থা সম্বলিত সুনির্দিষ্ট বিধি সংবিধানে সন্নিবিষ্ট করতে হবে; ৪. দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব থাকবে এবং অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা রাজ্যের হাতে থাকবে। তবে ফেডারেল সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা দুই অঞ্চল থেকে সমানভাবে কিংবা উভয়ের স্বীকৃত অন্য কোনো হারে আদায় করা হবে; ৫. দুই অংশের মধ্যে দেশিয় পণ্য বিনিময়ে কোনো শুল্ক ধার্য করা হবে না এবং রাজ্যগুলো যাতে যেকোন বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে সংবিধানে তার বিধান রাখতে হবে। ৬. প্রতিরক্ষায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে আধা-সামরিক রক্ষীবাহিনী গঠন, পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র কারখানা স্থাপন এবং কেন্দ্রীয় নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করতে হবে।
পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধী দলীয় নেতারা মুজিবুর রহমানের ছয়দফা কর্মসূচিকে পাকিস্তানের অখন্ডতা বিনষ্ট করার পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। আইয়ুব সরকার তাঁকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে এবং অবশেষে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার শুরু করে। এ মামলার বিরুদ্ধে সারা পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং ১৯৬৯ সালের প্রথমদিকে এ বিক্ষোভ গণঅভুত্থানের রূপ পরিগ্রহ করে। গণদাবির মুখে সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে বাধ্য হয়।
আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ছয়দফা কর্মসূচির স্বপক্ষে গণরায়ের জন্য নির্বাচনী প্রচারণা চালায়। এ নির্বাচনে শেখ মুজিব ছয়দফার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভ করেন। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক মীমাংসার পূর্বে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানে অসম্মতি জানান। শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় নেতৃবৃন্দ সহ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে ১৫ মার্চ (১৯৭১) থেকে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ হয় নি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে পাকবাহিনীর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের ফলে একদিকে ছয়দফা কর্মসূচির পরিসমাপ্তি ঘটে এবং নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। [বাংলাপিডিয়া]
(চ) সামাজিক বনায়ন । সামাজিক বনায়ন জনসাধারণ, বিশেষ করে পলীর জনগণ এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক, বাস্ত্তসংস্থানিক ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত বনায়ন। সামাজিক বনায়নের লক্ষ্য কেবল ‘গাছ নয়, গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীও’। এ ধরনের সহায়তার লক্ষ্য শুধু গাছ লাগানো ও সেসব গাছের যত্ন নেওয়ার জন্য নয়, বরং গাছ রোপণকারীরা যাতে লাগানো গাছের সুফল পাওয়ার আগ পর্যন্ত সসম্মানে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে তারও নিশ্চয়তা বিধান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রদত্ত সামাজিক বনায়নের সংজ্ঞা হচ্ছে ‘বনায়ন কার্যক্রমে জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্তকরণের যেকোন পরিস্থিতি’। শিল্পভিত্তিক বৃহদায়তন বনায়ন এবং কেবল কর্মসংস্থান ও মজুরিভিত্তিক উন্নয়ন সহায়ক অন্যান্য ধরনের বনায়ন সামাজিক বনায়ন নয়, বরং গোষ্ঠীভিত্তিক বনায়নে উৎসাহ ও সহায়তা প্রদানকল্পে বনশিল্প ও সরকারি প্রচেষ্টায় পরিচালিত কর্মকান্ড সামাজিক বনায়নের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করেন মাহবুবুল আলম চাষী, অধ্যাপক ইউনুস ও অধ্যাপক আলীমসহ কয়েকজন উদ্যোক্তা। তাঁরা চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বেতাগী ও পামোরা নামের দুটি বিরান পাহাড়ে এ প্রকল্প গ্রহণ করেন। এজন্য ১০১টি পরিবার বাছাই করে তাদের সেখানে জমি দেওয়া হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থসাহায্যে গৃহীত গোষ্ঠী বনায়ন প্রকল্প থেকেই মূলত সামাজিক বনায়নের কর্মসূচি শুরু। এজন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ১ কোটি ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার ঋণ মঞ্জুর করে। এছাড়া জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মাধ্যমে কারিগরি সাহায্য হিসেবে ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের সাতটি বৃহত্তর জেলায় দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও যশোরে এই প্রকল্প কার্যক্রম ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত চলে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি কাঠ, গবাদি পশুর খাদ্য, ছোটখাটো কাঠ, ফল ও অন্যান্য উৎপন্ন দ্রব্যের সরবরাহ বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক ১৯৯২-৯৩ সালে শুরু ৭ বছর মেয়াদি প্রকল্পে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বন বিভাগে বন ব্যবস্থাপনার দুটি অংশগ্রহণমূলক মডেল উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। একটি পরীক্ষাধীন প্রকল্প বন বিভাগের সম্প্রসারণ শাখার অধীনে গড়ে তোলার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে বনের ২-৩টি বকে অংশগ্রহণমূলক কৃষি বনায়ন কার্যক্রম শুরু করা হবে। ইতোমধ্যেই উপদেষ্টা নিয়োগ এবং প্রকল্প তৈরির কাজ শেষ হয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের পরীক্ষণ এখনও শুরু নি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী নামে আরেকটি শরিকানামূলক সামাজিক বনায়ন প্রকল্প থানা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন প্রকল্পের ধারনার ভিত্তিতে ১৯৯৪-৯৫ সালে শুরু হয়। উপকূলীয় ১০টি জেলা এই প্রকল্প অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো প্রকল্প অঞ্চলে অধিক পরিমাণে গাছপালা লাগিয়ে ঘূর্ণিঝড়জনিত প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা। বেসরকারি সংগঠনগুলিকে সম্পৃক্ত করে স্থানীয় জনসাধরণের মধ্যে উপকূলে বৃক্ষরোপণ কর্মকান্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে সবুজবেষ্টনী নির্মাণ বাস্তবায়িত হবে।